রাইডুর ঝড়কে ‘দখিনা বাতাস’ বানাল পোলার্ডের টাইফুন

এই ম্যাচকে আইপিএলের ‘এল ক্লাসিকো’ ঘোষণা করেছিল দুই দলের টুইটার অ্যাকাউন্ট। আইপিএলের সফল দুই দলের ম্যাচ, তাই মুম্বাই ইন্ডিয়ানস ও চেন্নাই সুপার কিংসের এমন দাবি নিয়ে খুব বেশি আপত্তি তোলার কিছু নেই। তবু কারও সন্দেহ থাকলে সে সন্দেহ উবে গেছে আজ। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের সেরা বিজ্ঞাপন যে দেখিয়ে দিল দুই দল।

দিল্লিতে আজ প্রথম ইনিংসে ২৭ বলে ৭২ রান তুলে ঝড় তুলেছিলেন আম্বাতি রাইডু। সে ঝড়ে ২১৮ রান তুলেছিল চেন্নাই। আর জবাবে কাইরন পোলার্ডের তাণ্ডব দেখল চেন্নাই। ৩৪ বলে ৮৭ রানের এক ইনিংসে রেকর্ড গড়া এক জয় এনে দিয়েছেন মুম্বাইকে। ইনিংসের শেষ বলে দলকে ৪ উইকেটের জয় এনে দিয়েছেন পোলার্ড। আইপিএল ইতিহাসে মুম্বাই কখনো এত রান তাড়া করে জয় পায়নি।

ঝড় ছিল ডু প্লেসির ব্যাটেও।
ঝড় ছিল ডু প্লেসির ব্যাটেও।ছবি: আইপিএল
যশপ্রীত বুমরা আজকের আগে এমন বেধরক পিটুনি খাননি। পাওয়ার প্লেতে এক ওভারে ৮ রান দিয়েছিলেন। মাঝের ওভার আর শেষ দিকে কিপটেমির জন্যই বেশি বিখ্যাত এই পেসার। তাই ১১তম ওভারে যখন ফিরলেন, তখন কল্পনাও করতে পারেননি সামনে কী হতে যাচ্ছে।

ছক্কা, ছক্কা, চার! প্রথম ৩ বলেই ১৬ রান দিয়ে বসলেন। পরের বলে এক রান নিয়ে অন্যপ্রান্তে গেলেন ফাফ ডু প্লেসি। তাতেই প্রাণ ফিরে পেলেন বুমরা। মঈন আলীকে আউট করে দিলেন পরের বলেই। শেষ বলে কোনো রান দিলেন না। দ্বিতীয় ওভারে তাই ১৭ রান দিয়েই থামলেন বুমরা।

কিন্তু মার খাওয়া কমল না বুমরার। ১৭ ও ১৯তম ওভারে বল করতে এসে আবারও চেন্নাইয়ের ব্যাটসম্যানদের তোপের শিকার। এবার রান দিলেন ২১ ও ১০ করে। ৪ ওভার শেষে বুমরার বোলিং ফিগার ৪-০-৫৬-১, আইপিএলে তাঁর সবচেয়ে খরুচে।

মঈন আলীও ভালো করেছিলেন।
মঈন আলীও ভালো করেছিলেন।ছবি: আইপিএল
চেন্নাই সুপার কিংসের আজকের ইনিংসটাকে তিনভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমভাগ বুমরার দ্বিতীয় ওভার পর্যন্ত। তৃতীয়ভাগ বুমরার তৃতীয় ওভারের আগের ওভার থেকে শুরু। আর মাঝের দ্বিতীয়ভাগটা মুম্বাই ও কাইরন পোলার্ডের।

প্রথম ওভারেই রুতুরাজ গায়কোয়াড়কে হারিয়ে বসে চেন্নাই। একে কোনো ধাক্কা বলেই মনে করতে দেননি ফাফ ডু প্লেসি ও মঈন আলী। পাওয়ার প্লেতে খুব একটা আগ্রাসী ছিলেন না দুজন। এসেছে ৪৯ রান। তাঁদের আসল রূপ টের পাওয়া গেল এর পরই। রান তোলায় এগিয়ে ছিলেন মঈন, আর চারের চেয়ে ছক্কা মারায় আগ্রহী বেশি থাকায় স্ট্রাইকরেটে এগিয়ে ছিলেন ফাফ। ১১তম ওভারের প্রথম বলেই এক শ পেরোয় চেন্নাই। ৩৩ বলে এর আগেই ফিফটি পেয়েছেন মঈন। ওই ওভারেই মঈন ফিরলেন বুমরার বলে। ৫ চার ও ৫ ছক্কায় ৫৮ রান করেছেন মঈন।

পরের ওভারেই ফিফটি হয়ে গেল ফাফ ডু প্লেসির। তাঁরটা আরও দ্রুতগতির। ২৭ বলে ২ চার ও ৪ ছক্কার ফিফটি। কিন্তু ১২তম ওভারের শেষ দুই বলে ম্যাচের রূপ বদলে গেল। ডু প্লেসি (৫০) ও রায়না (২) দুজনই পোলার্ডের শিকার।

মূল ঝড় দেখিয়েছেন রাইডু।
মূল ঝড় দেখিয়েছেন রাইডু।ছবি: আইপিএল
১৪তম ওভারে রবীন্দ্র জাদেজাকেও আউট করে দিয়েছিলেন পোলার্ড। কিন্তু রিভিউ নিয়ে এলবিডব্লুর সিদ্ধান্ত বদলে নেন জাদেজা। তখন মনে হচ্ছিল, ম্যাচের নাটাই পুরোপুরি মুম্বাইয়ের কাছে। ১১ ওভার শেষে ১১২ রানে থাকা চেন্নাইয়ের স্কোর ১৪ ওভার শেষে ১২৬। মাঝে দুটি উইকেটও গেছে।

রাইডুর খেলা শুরু হলো এরপর। রাহুল চাহারের ওভারে একটি ছক্কা মেরে হাত মকশো করে নিলেন, ওভারে এল ১০ রান। ১৬তম ওভারে ধবল কুলকার্নি এলেন। প্রথম ৪ বলে এক ওয়াইড দিয়েও মাত্র ৬ রান দিয়েছিলেন এই পেসার। শেষ দুই বল ইনিংসের বাকি গতিটা লিখে দিল। প্রথম ছক্কাটি গেল লং অন দিয়ে। পরেরটাও বোলারের মাথার ওপর দিয়ে উড়ল। পরের ওভারে এলেন বুমরা। রান আটকাতে এসেছিলেন, সঙ্গে সম্ভব হলে কিছু উইকেটও তুলে নেওয়ার চেষ্টা। পাঁচ বলে ১০ রান দিলেন। শেষ বলটা করল মূল সর্বনাশ। একে তো নো বল, তারওপর ছক্কা। ফ্রি হিট থেকে আরও ৪ রান নিলেন রাইডু।

পরের ওভারে এলেন ট্রেন্ট বোল্ট। প্রথম ৩ ওভারে ২২ রান দেওয়া বোল্টের ওভার থেকেও ২০ রান তুলে নিলেন রাইডু। এর মাঝেই ২০ বলে নিজের ফিফটি তুলে নিয়েছেন। ৩ চারের সঙ্গে ৫ ছক্কা! ১৯তম ওভারে রাইডু তেমন কিছু করতে পারলেন না, তবু ১০ রান এল। শেষ ওভারে প্রথম ৪ বলে মাত্র ৪ রান দিয়েছিলেন কুলকার্নি। কিন্তু শেষ ২ বলে আবার সর্বনাশ। পঞ্চম বলটা কোমর উচ্চতার ফুলটস। আয়েশ করে ছক্কা মারলেন রাইডু। পরের বলে ক্যাচ তুলে দিয়েছিলেন,কিন্তু সূর্যকুমার ধরতে তো পারলেনই না, উল্টো চার বানিয়ে দিলেন।

ঝড় যখন থামল তখন চেন্নাইয়ের রান ৪ উইকেটে ২১৮। আর রাইডু ২৭ বলে ৭২ রান করে অপরাজিত। ৪টি চার ও ৭টি ছক্কা মেরেছেন রাইডুর। চেন্নাইয়ের আক্ষেপ, অন্যপ্রান্তে জাদেজা যদি ২২ বলে ২২ রান না নিয়ে একটু আগ্রাসী হতেন, তাহলে আজ হয়তো আড়াই শ রানও দেখা যেতে পারত। তাহলেই হয়তো আজ আর হারতে হতো না।

পোলার্ডের ঝড় চেন্নাইকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
পোলার্ডের ঝড় চেন্নাইকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।ছবি: আইপিএল
আইপিএলে ২১৯ রানের লক্ষ্য পেয়েও জয়ের স্বপ্ন দেখার মতো ব্যাটিং লাইনআপ যদি কারও থাকে সেটা মুম্বাইয়ের। উদ্বোধনী জুটিতে রোহিত শর্মা ও কুইন্টন ডি কক ভালো শুরু এনে দিলে শেষ দিকে ঝড় তোলার মতো ভয়ংকর সব ব্যাটসম্যানে ভরা লাইনআপ।

প্রথম ৭ ওভার ভালোই চলছিল সব। দুই প্রান্তে সমানতালে রান তুলছিলেন রোহিত ও ডি কক। বিনা উইকেটে ৬৮ রান তুলে ফেলেন দুজন। এরপরই শুরু হয় মহেন্দ্র সিং ধোনি-জাদু। প্রথমে বদলি হিসেবে এলেন শার্দুল ঠাকুর। রোহিতকে (৩৫) নিজের চতুর্থ বলে তুলে নিলেন এই পেসার। পরের ওভারে এলেন রবীন্দ্র জাদেজা। তাঁর চতুর্থ বলেও উইকেট, এবার ফিরলেন সূর্যকুমার (৩)। দুই দিকে বাঁহাতি, তাই আনা হলো মঈন আলীকে। এই অফ স্পিনারের চতুর্থ বলেই বিদায় নিলেন ডি কক (৩৮)! ১০ ওভার শেষে মুম্বাইয়ের রান ৩ উইকেটে ৮১। ৩ ওভারে মাত্র ১৩ রান তুলতেই টপ র্ডার শেষ মুম্বাইয়ের।

বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের তবু আশা ছিল। উইকেটে ক্রুনাল পান্ডিয়া ও কাইরন পোলার্ড। নামার অপেক্ষায় হার্দিক পান্ডিয়া ও জিমি নিশাম। শেষ ৮ ওভারে ১২৫ রান দরকার ছিল মুম্বাইয়ের। ওভার প্রতি প্রায় ১৬ রান।

৩ উইকেট নিয়ে কারেন ম্যাচ জমিয়ে দিয়েছিলেন।
৩ উইকেট নিয়ে কারেন ম্যাচ জমিয়ে দিয়েছিলেন।ছবি: আইপিএল
পোলার্ড মুম্বাইকে আশা দেখানো শুরু করলেন। ১৩ ওভারে শুরু হলো তাঁর ঝড়। জাদেজার ওভারে ৩ ছক্কায় ২০ রান তুললেন। লুঙ্গি এনগিডির পরের ওভারে ২ ছক্কায় এল আরও ১৬ রান। শার্দুল ঠাকুরের পরের ওভারে এক ছক্কার সঙ্গে ৩ চার, এল ২৩ রান! প্রায় অসম্ভব লক্ষ্যটা নিমিষেই ৫ ওভারের ৬৬ রানে নেমে এল। ১৭ বলে ফিফটি পেরিয়ে যাওয়া পোলার্ডে সঙ্গে ক্রুনালও যোগ দিলেন পরের ওভারে।

এনগিডির বলে এক ছক্কা ও দুই চারে ১৬ রান এনে দিলেন ক্রুনাল। এর মাঝে শেষ বলে ক্যাচ তুলে দিয়েছিলেন,সেটা ধরতে পারেননি গায়কোয়াড়, বরং চার বানিয়ে দিয়েছেন। ৪ ওভারে ৫০ দরকার ছিল মুম্বাইয়ের।

একপেশে হয়ে যাচ্ছে দেখেই আবার হয়তো রং বদলালো ম্যাচ। স্যাম কারেনের বলে হঠাৎ আউট ক্রুনাল। ১৭ ওভার থেকে মাত্র দুই রান পেল মুম্বাই।

পোলার্ডের ক্যাচ ফেলেছেন উ প্লেসি।
পোলার্ডের ক্যাচ ফেলেছেন উ প্লেসি।ছবি: আইপিএল
পরের ওভারে আবারও নাটক। প্রথম তিন বলে এক ছক্কা ও চার মারা পোলার্ড পঞ্চম বলে ক্যাচ তুলে দিয়েছিলেন। সেটা ফেলে দিয়েছেন ফাফ ডু প্লেসির মতো ফিল্ডার। ৬৮ রানে জীবন পেলেন পোলার্ড। সে ওভারে মুম্বাইয়ের প্রাপ্তি ১৭ রান।

২ ওভারে ৩১ রান দরকার, এই ওভারে আবার কারেন এলেন বোলিংয়ে। প্রথম ২ বলে দুই ছক্কা মারলেন হার্দিক পান্ডিয়া। চতুর্থ বলে ওই ডু প্লেসির হাতে ক্যাচ দিলেন পান্ডিয়া। মাঝে এক রান, পরের বলেই আউট নিশাম!

শেষ ওভারে ১৬ রান দরকার ছিল মুম্বাইয়ের। স্ট্রাইকে ২৮ বলে ৭১ রানে থাকা পোলার্ড। এনগিডির প্রথম বলে কোনো রান পাননি, পরের বলে ইয়র্কার পেয়েও চার মারলেন। পরের বলটা ছিল ফুলটস, বাউন্ডারি তো হবেই! পরের বল আবার ডট। শেষ দুই বল থেকে ৮ রান দরকার মুম্বাইয়ের। পঞ্চম বল আবার ফুলটস। ডিপ স্কয়ার লেগ দিয়ে আছড়ে পড়ল বল।

শেষ বলে ২ রান দরকার ছিল। ইয়র্কার লেংথের বল কোনোমতে ঠেকিয়েই ছুটলেন পোলার্ড। লং অন থেকে দৌড়ে ডু প্লেসি বল পাঠানোর আগেই দুই রান করে ফেললেন পোলার্ড। ৩৪ বলে ৮৭ রানে অপরাজিত পোলার্ড দলকে জিতিয়েই ফিরলেন। অতিমানবীয় ইনিংসে ৬ চারের সঙ্গে ৮ ছক্কা মেরেছেন পোলার্ড।

Check Also

বৃষ্টিতে মাহমুদউল্লাহ-সাইফদের ম্যাচ ভেস্তে গেল

ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগের চলতি মৌসুমে শিরোপার দৌড়ে বেশ ভালোভাবে আছে প্রাইম দোলেশ্বর স্পোর্টিং …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

x
www.jagrotojanata.com want to
Show notifications for the latest News&Updates