একটি ছোট গ্রাম বিলঘর

একটি ছোট গ্রাম বিলঘর।

কবি ফিরে আসতে চান বারবার এমন এক গ্রামে, যেখানে লক্ষ্মীপেঁচা ডাকে শিমুলের ডালে, সন্ধ্যার বাতাসে ওড়ে সুদর্শন, সবুজ করুণ ডাঙা জলাঙ্গীর ঢেউয়ে ভেজা থাকে। পায়ে লাল ঘুঙুর পরা কিশোরী হয়ে কলমীর গন্ধভরা জলে ভাসতে ভাসতে হাঁস হতে চান কবি। কার্তিকের নবান্নে কুয়াশার বুকে ভেসে ভোরের কাক, শালিক, ধবল বক কিংবা শঙ্খচিল হয়েই আবার ধানসিঁড়ির তীরে ফেরার ইচ্ছা সেই কবির। প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশের মতো এমন করে যেই গ্রাম কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও মন ভুলিয়ে দিত আজ আমরা তেমন এক সুনসান নীরব গ্রামের কথাই বলব। যেখানে প্রকৃতি তার সকল সুন্দর নিয়ে বসে আছে পরিব্রাজকের মন জোগাতে।

এবারের ঈদের ছুটিতে পারিবারিক বন্ধু ও স্বজনদের নিয়ে নতুন করে গ্রাম ঘুরে দেখার সাধ হলো আমাদের। ঈদের দিনই ছুটলাম বি, বাড়ীয়ার, কসবা উপজেলার বিলঘর গ্রামে। যেই গ্রাম প্রতিটি মৌসুমে প্রকৃতির রূপ বদলের সাক্ষী হতে নিজের রং-রূপও বদলে নেয় দারুণভাবে। বৈশাখে আম্রমুকুলের ঘ্রাণে মাতোয়ারা গ্রাম সাজে কৃষ্ণচূড়ার লালে।

আমরা দুপুরের রোদ্দুর মাথায় করে যাচ্ছি। গরম কাটিয়ে দিচ্ছে জল ছুঁয়ে আসা শীতল হাওয়া আর রৌদ্রতাপ ঢেকে রাখছে মাঝির দেওয়া কাঠের ডাটওয়ালা পুরোনো আমলের বড় ছাতা। এদিক-সেদিক চলছে শৌখিন জেলেদের বাহারি জালে মৎস্য আহরণ। ত্রিকোণ আকৃতির বেহাল জাল অথবা চৌকোণের চড়ক জাল হাত বা পায়ের চাপে জল থেকে তুলতেই রুপালি মাছেদের দাপাদাপি-লাফালাফি। যার জালে যত বেশি মাছ, তার হাসি তত চওড়া। বর্ষার জলে ঘুরবেন আর দেশজ মিষ্টি পানির এমন মৎস্য আহরণ দেখবেন না তা তো হয় না। চাইলে এই গ্রামে ঢোকার পথেই মাথাভাঙ্গা বিলের পাশের কোনো এক বাড়িতে অর্ডার দিয়ে কাচালঙ্কা সহযোগে ফুটি, মলা, খলসে, কই, টেংরা, মেনি, কাকিলা বা বড় রুই-কাতলার মুচমুচে ভাজাও খেয়ে নিতে পারবেন।

আমরা এখন গ্রামের দক্ষিণ পাশের সীমানায় বর্ষায় সৃষ্ট অস্থায়ী জলাধারে। দেখলে মনে হবে যেন কোনো এক গহিন বিল। খানিক দূরে কলাগাছের ভেলায় করে শামুক কুড়োচ্ছে গ্রাম্যবালা। আশপাশে ফুলের মৌনতা। শাপলা সাধারণত সকালে ফোঁটে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে অবগুণ্ঠিত করে ফেলে। হয়তো কড়া রৌদ্রের ছোঁয়াচ ওদের ভালো লাগে না। প্রকৃতিও দারুণভাবে ধারণ করে বাংলাদেশের লাল সবুজ রং। আর এভাবেই জনপদে আঁকা হয়ে যায় আমাদের প্রাণের বাংলাদেশ।

আজ সবুজ পত্রপল্লব ও বিমুগ্ধ পরিব্রাজকের অবজেক্টে ছবি হয়ে ওঠে অনির্বচনীয় সুন্দর।

এই গ্রামে প্রকৃতি তার রূপ দেখানোয় বড় উদার ও প্রেমময়। বর্ষার সবুজ আর শরৎ মেঘের মেলবন্ধন দেখতে চাইলে ছুটতে হয় এমন গ্রামের স্বর্গেই। আর কণ্ঠে তখন নিশ্চয় অনুরণন তুলবে নির্মলেন্দু গুণের ‘হুলিয়া’-
দীর্ঘ পাঁচ বছর পরিবর্তনহীন গ্রামে ফিরছি আমি
সেই একই ভাঙাপথ, একই কালো মাটির আল ধ’রে গ্রামে ফেরা
আমি কতদিন পরে গ্রামে ফিরছি।

এমন মনোমুগ্ধকর গ্রাম যেখানে কান পাতলেই মেলে বাতাসে আন্দোলিত গাছের শব্দ, ভাটিতে জল বয়ে চলার শব্দ, মেঘের গর্জন, পাখপাখালির ডাক। এসবের মিলিত শব্দ সংগীত হয়ে বাজে পরিব্রাজকের কর্ণকুহরে। আর দৃষ্টি জুড়ায় অসীম আকাশ। স্বচ্ছ সফেদ জলরাশি ও শস্য সবুজে গ্রামীণ মানুষের যাপিতজীবন দেখতে হলে বর্ষার গ্রাম একবার হলেও দেখা চাই।

আমরা তো বহু ব্যয় করে বহু ক্রোশ দূরে পর্বতমালা ,পাহাড়, ঝরনা, সমুদ্র, হাওর, নদী বা প্রত্নতাত্তিক স্থাপনা দেখতে দেখতে যাই। এবার না হয় শহরের চার দেয়ালে বন্দি হাপিয়ে ওঠা জীবন থেকে মুক্তি পেতে একটি ধানের শীষের ওপর একটি শিশুর বিন্দু দেখতেই বাংগুরীর মতো গ্রামে ফিরে যাই। এমন গ্রাম রবিঠাকুরের মতো করে পায়ে ধরে আপনাকে ঘরের বাহির না করে পারে? তাহলে কবি জসীমউদ্দীনের ‘নিমন্ত্রণ’ থাকল ভ্রমণপিপাসু আপনাকেও :

তুমি যাবে ভাই যাবে মোর সাথে আমাদের ছোট গাঁয়
গাছের ছায়ায় লতায় পাতায় উদাসী বনের বায়;
মায়া মমতায় জড়াজড়ি করি
মোর গেহখানি রহিয়াছে ভরি,
মায়ের বুকেতে, বোনের আদরে, ভায়ের স্নেহের ছায়…

বিলঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ।

বিদ্যালয় হল আমাদের ছাত্র জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। জীবনের এই মানমন্দিরে আমরা বড় হয়ে উঠতে শিখি, পড়াশোনা শিখি, জীবনে লব্ধ অভিজ্ঞতাকে জীবনচর্যায় কেমন করে কাজে লাগাতে হয়, শিখি সেটাও। বিদ্যালয়ে সারা জীবনের মতন বিভিন্ন বন্ধুদের সঙ্গে আমাদের পরম সখ্যতা গড়ে ওঠে, শিক্ষকদের সঙ্গে গড়ে ওঠে শাসন ও স্নেহের বন্ধন। আর এই বিদ্যালয়েই তৈরি হয় জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান নানা স্মৃতি। বিদ্যালয় জীবনে হয়তো এই সব স্মৃতির মাহাত্ম্য সম্পূর্ণরূপে অনুধাবন করা যায় না; কিন্তু জীবনের মধ্যগগনে দাঁড়িয়ে যখন এই দিনগুলির দিকে মানুষ পিছন ফিরে তাকায় তখন সেই সব স্মৃতির কথা মনকে দোলা দিয়ে যায়। সাধারণভাবে আমাদের সমগ্র বিদ্যালয় জীবন প্রায় ৫ বৎসরের। এই দীর্ঘ সময় জুড়ে আমরা অসংখ্য ছোট-বড় অভিজ্ঞতার সাক্ষী হই।

মসজিদঃ ছোট-বড় ৬টি মসজিদ রয়েছে এই ছোট্টো গ্রামে।
ঈদগাহঃ বিলঘর গ্রামে ঈদগাহ সংখ্যা ৩ টি।
বাজারঃ বাজারের সংখ্যা ১টি। নাম দেওয়া হয়েছে “হাদিস মার্কেট”

একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানঃ ফিসারী এন্ড হ্যাচারি
মালিকঃ শফিকুল ইসলাম রঙ্গু (দারোগা)

যাতায়াত
ঢাকা থেকে এই গ্রামের দূরত্ব মাত্র ১২৫ কিলোমিটারের মতো। কাজেই ভ্রমণ শেষে ঢাকা ফেরা যাবে । ভাড়া ২০০ থেকে ৫০০ টাকা

ভ্রমণ সতর্কতা

গ্রামের মানুষ খুবই অতিথিপরায়ণ ও মিশুক। তাদের সাথে ঠুনকো কোনো বিষয় নিয়ে অযথা তর্কে না জড়ানো ভালো। মনে রাখতে হবে নিজের এলাকায় গ্রামবাসীরা খুব একতাবদ্ধ। মন্দ ব্যবহারে সেই একতা ফুঁসে না উঠুক। ভ্রমণ হোক আনন্দময়।

লেখকঃ মোঃ আব্দুল্লাহ

Check Also

গ্রেফতার কাদের মির্জার অনুসারী

নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা খিজির হায়াত খানকে লাঞ্ছিত করার ঘটনায় বসুরহাট …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

x
www.jagrotojanata.com want to
Show notifications for the latest News&Updates