খাসোগির স্ত্রী-বাগদত্তাকে নিয়ে ভয়ংকর তথ্য ফাঁস

রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী, সরকারি কর্মকর্তা, বিজ্ঞানী, ব্যবসায়ী, ধর্মীয় নেতাসহ গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণি-পেশার মানুষের ফোনে আড়িপাতার ঘটনা ফাঁস হয়েছে। এ তালিকায় বিভিন্ন দেশের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীরা রয়েছেন।

 

ফাঁস হওয়া এ তালিকায় বিশ্বের অন্তত ১৮০ জন সাংবাদিকের ফোন নম্বর রয়েছে। এ তালিকায় রয়েছে তুরস্কের ইস্তাম্বুলের সৌদি কনস্যুলেটে খুন হওয়া ওয়াশিংটন পোস্টের আলোচিত সাংবাদিক জামাল খাসোগির স্বজনরাও।

 

ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে জানা গেছে, খাসোগি খুন হওয়ার আগে ও পরে তার ঘনিষ্ঠজনদের ফোনে আড়ি পাতা হয়। ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

বিশ্লেষণে জানা গেছে, খাসোগির স্ত্রী হানান এলাতার ও তার বাগদত্তা হেতিজে চেঙ্গিসের মুঠোফোনে আড়ি পাতা হয়। এছাড়া খাসোগি হত্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শীর্ষ দুই তুর্কি কর্মকর্তার ফোনেও পাতা হয় আড়ি।

২০১৮ সালের ২ অক্টোবর দ্বিতীয় বিয়ের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করতে ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটে যান ওয়াশিংটন পোস্টের আলোচিত সাংবাদিক জামাল খাশোগি। এরপর আর বের হননি। পরে জানা যায়, তাকে কনস্যুলেটের ভেতরই হত্যা করা হয়। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের অনুমোদনেই এ হত্যাকাণ্ড হয়। কারণ যুবরাজ সালমানসহ সৌদি আরবের শাসকগোষ্ঠীর কঠোর সমালোচক ছিলেন খাসোগি। এ নিয়ে তিনি বেশ কিছু লেখা লিখেছেন ওয়াশিংটন পোস্টে। যদিও সৌদি আরব এ হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিল। খাসোগির মরদেহের সন্ধান অবশ্য এখনো মেলেনি।

এরমধ্যে নতুন এ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, খাসোগির স্ত্রী হানান এলাতার ও তার বাগদত্তা হেতিজে চেঙ্গিসকে নিয়ে এ তথ্য ফাঁস হলো। হানান এলাতারকে খাসোগি বিয়ে করেছিলেন ২০১৮ সালের জুনে। আর তার ফোনও ছিল পেগাসাসের লক্ষ্যবস্তু। তার ফোনটি ছিল অ্যান্ড্রয়েড ফোন। হানান ছিলেন ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট। তিনি খাসোগির প্রেমে পড়েছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে বিয়ে করেছিলেন।

এছাড়া খাসোগির বাগদত্তা হেতিজে চেঙ্গিসের ফোনও ছিল লক্ষ্যবস্ত। হেতিজের মুঠোফোনটি ছিল আইফোন। খাসোগিকে হত্যার পর দিনে পাঁচবার তার ফোনে নজরদারি করা হতো বলে জানা গেছে।

ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠান এনএসওর ক্লায়েন্ট পেগাসাস নামের এ সফটওয়্যার বিভিন্ন দেশ ব্যবহার করে থাকে। এসব দেশের ৫০ হাজারের বেশি মুঠোফোন থেকে পেগাসাস ব্যবহার করা হয় হ্যাকিংয়ের জন্য। এই ৫০ হাজার ফোনের নম্বর তালিকায় হানান ও হেতিজের ফোন নম্বর ছিল। এ ছাড়া খাসোগির আরেক ঘনিষ্ঠ সহযোগীর ফোন হ্যাক করা হয়েছিল তাকে হত্যার পর। এখানেই শেষ নয়, খাসোগিকে হত্যার পর যারা এ তদন্তকাজে অংশ নিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে তুরস্কের দুজন এবং খাসোগির দুই সহযোগীর ফোন নম্বর রয়েছে সেই ৫০ হাজার ফোনে।

এদিকে খাসোগি খুন হওয়ার পর অনেকের জীবন বদলে গেছে। তাদের মধ্যে অন্যতম হানান ও হেতিজে। খাসোগির সঙ্গে যখন হানানের প্রেম শুরু হয়েছিল তখন থেকেই ঝুঁকির মধ্যে ছিলেন হানান। তিনি এখনো ওয়াশিংটনে থাকেন। আত্মগোপনে রয়েছেন তিনি। রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছেন হানান।

অন্যদিকে খাসোগির সঙ্গে পরিচয়ের আগে হেতিজে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কাজ করেছেন। পারস্য উপসাগরীয় বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করতেন তিনি। এ জন্য বৃত্তিও পেয়েছেন। হেতিজে বলেন, খাসোগির সঙ্গে সাক্ষাতের আগে আমি সত্যিকার অর্থেই অসাধারণ জীবন যাপন করেছি। কিন্তু খাসোগি হত্যার পর কাজে ফিরতে পারছি না।

তিনি বলেন, আমি এখন আর কোনো আরব দেশে ভ্রমণ করতে পারি না। আপনি কি এটা কল্পনা করতে পারেন? হেতিজের প্রশ্ন, সারা জীবন ধরে তিনি কেন এভাবে মূল্য দিয়ে যাবেন?

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, ফাঁস হওয়ার এ ঘটনাটি প্রথমে জানতে পারে প্যারিসভিত্তিক সংস্থা ফরবিডেন স্টোরিজ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। পরে সেটি গার্ডিয়ান, দ্য অয়্যারসহ ১৭টি সংবাদমাধ্যমের হাতে পৌঁছে। সংবাদ মাধ্যমগুলো তাদের যৌথ অনুসন্ধানের নাম দিয়েছে ‘পেগাসাস প্রজেক্ট’। ইসরায়েলি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এসএসও গ্রুপ পেগাসাস নামে এ ম্যালয়্যার তৈরি করেছে, কোম্পানিটির নামেই এর নামকরণ করা হয়েছে।

এটি আইফোন বা অ্যান্ড্রয়েড মোবাইলে প্রবেশ করে ব্যবহারকারীর মেসেজ, ছবি, ইমেইল পাচারের পাশাপাশি কল রেকর্ড বা মাইক্রোফোন চালু করে রাখার মতো ভয়ংকর ঘটনাও ঘটাতে পারে। তালিকায় থাকা ৫০ হাজার ফোন নম্বর ৪৫টি দেশের যার মধ্যে এক হাজারের বেশি নম্বর ইউরোপের দেশগুলোর।

Enjoyed this article? Stay informed by joining our newsletter!

Comments

You must be logged in to post a comment.

About Author